আমাদের ইংরেজি হয় না?

অভিনেতা অনন্ত জলিলের একটি ভাইরাল ক্লিপ ছিল; যেখানে তিনি একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন উনি ঘানার বাসিন্দা কিনা। তিনি যেভাবে ‘from’ উচ্চারণ করেছিলেন তা ‘pom’-এর মতো শোনাচ্ছিল তবে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন তা স্পষ্ট ছিল। ‘হিরো’ আলমের একটি পুরানো ভিডিও, যেখানে তিনি তার ইংরেজি দিয়ে একটি মেয়েকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছিলেন, সেখানেও একই জিনিস দেখা যায়। তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন তা স্পষ্ট ছিল যদিও উনার উচ্চারণ দুর্বোধ্য ছিল।

আমার পরিচিতদের একজন সম্প্রতি তার উচ্চারণের জন্য উপহাসের শিকার হয়েছিলেন। উনি এতটাই ট্রমাটাইজড ছিলেন যে রীতিমতো প্রতিজ্ঞা করে বসেছিলেন যে, একেবারে ইংরেজদের মতো করে ইংরেজি উচ্চারণ করা শিখবেন।

আমি জেমস কুক ইউনিভার্সিটির ডক্টর আবু সালেহ মোহাম্মদ রাফির সঙ্গে ঘটনাটা শেয়ার করে জিজ্ঞেস করলাম নেটিভদের মতো উচ্চারণে বিদেশি ভাষায় কথা বলা কি গুরুত্বপূর্ণ? তিনি এক কথায় উত্তর দিলেন, ‘না’।

সময় সংবাদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন যে, ভাষার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো যোগাযোগ স্থাপন করা এবং আপনার বার্তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাই ইংরেজি শব্দ উচ্চারণের সময় ইংরেজদের মতো উচ্চারণের চেষ্টার দরকার নেই।

ডক্টর রাফির মতে, ‘নেটিভ স্পিকারিজম’ একটি মিথ। ইংরেজদের মতো ইংরেজি উচ্চারণ বা উচ্চারণ করার চেষ্টা আমাদের বাংলাদেশি পরিচয় নষ্ট করে দেয়, অর্থাৎ এ ধরনের প্রচেষ্টা দিনশেষে শুধু সময় নষ্ট করে।

তিনি বলেন, যদি বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ইংরেজিকে একটা নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করতে শুরু করে (যেমনটা ভারতীয়রা বা সিঙ্গাপুরের লোকজন করতে সক্ষম হয়েছে), তবে তারা ইংরেজির স্থানীয় ভাষাভাষী বা নেটিভ স্পিকার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সময় সংবাদ: যোগাযোগ, অর্থাৎ আপনার চিন্তা/অনুভূতি অন্য পক্ষ/পক্ষের কাছে পৌঁছে দেয়া ছাড়া ভাষার উদ্দেশ্য কী?

ডক্টর আবু সালেহ মোহাম্মদ রাফি: আমার মতে, ভাষার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো যোগাযোগ স্থাপন করা, মানে আপনি যার সাথে কথা বলছেন উনাকে আপনি যা বলতে চান তা বোঝানো। যোগাযোগ ছাড়াও ভাষা তার ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন কাজে আসে।

মানুষ যে ভাষা ব্যবহার করে তার উপভাষা এবং উচ্চারণ শুনে আপনি সহজেই একটি নির্দিষ্ট এলাকার অধিবাসীদের শনাক্ত করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রামের লোকেরা একটি বাংলা উপভাষায় কথা বলে যা নওগাঁর লোকেরা করে না। এই অর্থে ভাষা আপনার পরিচয় প্রকাশ করার মাধ্যম হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন: প্রাথমিকের শিক্ষকদের বদলির আবেদনের সময় বাড়ল

একটি নির্দিষ্ট ভাষা অন্যান্য ভাষা এবং তাদের ভাষাভাষীদের প্রান্তিক/তুচ্ছও করতে পারে। যেমন ধরুন, আমরা বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে খুব গর্ব করি। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বেসরকারি খাতে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার বিস্তার এতো বেশি যে তা বাংলা ভাষাকে প্রান্তিক করে রেখেছে। অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলা মাধ্যম থেকে আসা ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা এসব ‘শুধুমাত্র ইংরেজি মাধ্যমের’ ক্লাসে কী রকম সমস্যায় পড়ে।

আবার টাকার সঙ্গেও ভাষার সম্পর্ক আছে। ইংরেজি ভাষায় ’দক্ষ করার’ কথা বলে দেশজুড়ে কতগুলো কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে তা ভাবুন একবার, অথচ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলা এবং অন্যান্য দেশীয় ভাষার আর্থিক মূল্য (মানিটাইজেশন) বাড়ানোর জন্য দৃশ্যমান কোনো প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাই।

সময় সংবাদ: ইংরেজদের মতো করে ইংরেজি শব্দ উচ্চারণ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ডক্টর আবু সালেহ মোহাম্মদ রাফি: আমার মতে, ইংরেজি বলার সময় একজন নেটিভ স্পিকারের মতো করে উচ্চারণের চেষ্টা করার দরকার নেই।

দেখুন, ‘ইংরেজ’ কোনো একচেটিয়া জাতি নয়। উদাহরণস্বরূপ, লন্ডন ‍আর লিভারপুলের বাসিন্দাদের ইংরেজির মধ্যে একটি স্পষ্ট ভাষাগত পার্থক্য রয়েছে। ব্যক্তিগত পছন্দ থেকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষদের কথা বলার ধরন গ্রহণ করতে পারে। তবে আমার মতে, এতে গোড়ামি এবং বৈষম্য প্রকাশ পেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, যেহেতু বাংলা এবং ইংরেজির ধ্বনিতত্ত্ব ভিন্ন, তাই বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য ইংরেজি ভাষাভাষীদের যেকোনো দলের মতো করে উচ্চারণে কথা বলা বেশ কঠিন হবে। উদাহরণস্বরূপ, ইংরেজি শব্দ উচ্চারণ করার সময় বাংলাভাষীদের পক্ষে সবসময় বিভিন্ন স্বরবর্ণের মধ্যে পার্থক্য না করতে পারাটা খুবই স্বাভাবিক। এটি আপনার ‘ইংরেজদের মতো’ উচ্চারণকে প্রভাবিত করবে।

আপনি সেই দক্ষতাগুলো (ইংরেজদের মতো করে শব্দ উচ্চারণ) আয়ত্ত্ব করতে পারলেও আপনি আপনার বাংলাদেশিদের মতো কথা বলার পদ্ধতিটাকে ঝেড়ে ফেলছেন, আপনার নিজের নয় এমন একটি পরিচয়ের জন্য আপনার বাংলাদেশি পরিচয়টা মুছে ফেলছেন। এতো কষ্ট করে আসলে কোনো লাভ নেই।

আরও পড়ুন: এসএসসির টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময় বেঁধে দিল বোর্ড

সময় সংবাদ: যদি আমি একজন নেটিভ স্পিকারের মতো করে ইংরেজি উচ্চারণ করতে না পারি বা তাদের মতো করে কথা বলতে না পারি, তাহলে কি আমার ‘ইংরেজি’ বলা শুদ্ধ হবে না?

ডক্টর আবু সালেহ মোহাম্মদ রাফি: এই প্রশ্নের জন্য আমি আমার আগের উত্তরটি উল্লেখ করব। ’নেটিভ স্পিকারের’ সংজ্ঞা মূলত একটি মনঃকল্পিত ব্যাপার।

সমাজভাষাতত্ত্ব সাম্প্রতিক অধ্যয়নগুলো ’নেটিভ স্পিকারিজম’ ধারণাটিকে ঝেড়ে ফেলেছে। ইংরেজির বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যেমন ব্রিটিশ ইংরেজি, আমেরিকান ইংরেজি, অস্ট্রেলিয়ান ইংরেজি, কানাডিয়ান ইংরেজি, আফ্রিকান আমেরিকান ইংরেজি, চাইনিজ ইংরেজি (চিংলিশ), সিঙ্গাপুরিয়ান ইংরেজি (সিঙ্গলিশ) ইত্যাদি। ভারতীয় ইংরেজিও এখন সার্বজনীন হয়ে উঠছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কোন সংস্করণের নেটিভ স্পিকারদের মতো কথা বলতে চান?

এখানে একটা ব্যাপার আছে। যদি বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ইংরেজির নিজস্ব একটা সংস্করণ তৈরি করতে শুরু করে, তবে তারা ইংরেজির স্থানীয় ভাষাভাষী হিসেবে বিবেচিত হবে।

সময় সংবাদ: আমরা জানি যে কিছু শব্দের অর্থ উচ্চারণের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু আমি অনেক নেটিভ স্পিকারকে বলতে শুনেছি যে তাদের মতো করে উচ্চারণ করার দরকার নেই, শুধু বোঝাতে পারলেই চলবে। ইংরেজির ব্যাপারটাও কি একই?

ডক্টর আবু সালেহ মোহাম্মদ রাফি: আপনি যদি সিডনি, মেল

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*