এই টাকা ওসি, ট্রাফিক পুলিশের যত লোক আছে, সবাই খায়’

তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশায় চালকের পাশের আসনে একজন এবং পেছনে আরও দুজন যাত্রী বসতে পারেন। রাজধানীর তুরাগ এলাকায় ব্যাটারিচালিত অবৈধ এ রিকশাগুলো স্থানীয়ভাবে ‘মিশুক’ নামে পরিচিত। এ রিকশা (মিশুক) চালাতে প্রতি মাসেই টোকেন কিনতে হয়। মিশুক মালিক সমিতি নামের একটি সমিতি টোকেন বিক্রি করে। আর ওই সমিতি পরিচালনা করেন স্থানীয় দুজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের স্বজনেরা। একেকটি টোকেন এক হাজার টাকায় কিনতে হয়, যা দিয়ে এক মাস রিকশাটি চালানো যায়।

তুরাগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের একাধিক রিকশাচালক, মালিক ও রিকশার ব্যাটারি চার্জের গ্যারেজমালিকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। তাঁরা জানান, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডে রিকশার টোকেন-বাণিজ্য ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নাসির উদ্দীনের ছেলে শফিকুল ইসলাম ওরফে স্বপনের নিয়ন্ত্রণে। আর ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেনের চাচা বাবুল হোসেন নিয়ন্ত্রণ করেন ওই এলাকার টোকেন বিক্রি। তিনি ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি।

 

এসব টোকেন বিক্রির জন্য নাজমুল হাসান ও ইসমাইল হোসেন নামের দুই ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছেন ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ছেলে শফিকুল ইসলাম। তুরাগের নয়ানগর ঈদগাহ মাঠের পূর্ব পাশে থাকা মিশুক মালিক সমিতির কার্যালয়ে টোকেন বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর খালপাড়ে দায়িত্বে থাকা লাইনম্যান কামাল হোসেনের কাছ থেকেও টোকেন কেনা যায়। টোকেন বিক্রির কথা প্রথম আলোর কাছে স্বীকারও করেন কামাল।

৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলরের চাচার হয়ে টোকেন বিক্রি করেন ফারুক খান নামের এক ব্যক্তি। তিনি ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের ২ নম্বর ইউনিট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তুরাগের কামারপাড়া পুরাতন বাজার (২০ নম্বর রোড) এলাকায় থাকা ফারুকের দোকান থেকে টোকেন কিনতে হয়। এ ছাড়া কামারপাড়া ট্রাফিক পুলিশ বক্স এলাকায় ফারুকের নিয়োজিত লাইনম্যান বারেক, বায়োজিদ ও শহিদুলের কাছ থেকেও টোকেন কেনা যায়।

তুরাগ থানার দুটি ওয়ার্ডে মিশুক মালিক সমিতির নামে রিকশার টোকেন বিক্রি করে মাসে প্রায় ২৩ লাখ টাকা আদায় করা হয়, যাকে ‘জুলুম’ বলছেন রিকশার মালিক ও চালকেরা
তুরাগ থানার দুটি ওয়ার্ডে মিশুক মালিক সমিতির নামে রিকশার টোকেন বিক্রি করে মাসে প্রায় ২৩ লাখ টাকা আদায় করা হয়, যাকে ‘জুলুম’ বলছেন রিকশার মালিক ও চালকেরা ছবি: প্রথম আলো
টোকেন বিক্রির বিষয়ে বক্তব্য জানতে নাজমুল হোসেনের মুঠোফোনে ফোন করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। আরেকজন টোকেন বিক্রেতা ইসমাইল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মিশুক মালিক সমিতির মূল দায়িত্বে ফারুক খান। তাঁর কাছ থেকেই সব টোকেন আসে।

টোকেন বিক্রির সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে দাবি করেছেন ফারুক খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রাজনীতি করেন বলে ট্রাফিক পুলিশ রিকশা আটক করলে অনেকে তাঁর কাছে ছুটে এসে রিকশা ছাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি তখন রিকশামালিকদের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা নিয়ে নিজের পকেট থেকে আরও ২০০ টাকা দিয়ে রিকশা ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করেন।

টোকেন বাবদ ‘২৩ লাখ টাকা’ চাঁদাবাজি
ঢাকা উত্তর সিটির ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় আড়াই হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। তবে যেসব রিকশা স্থানীয় আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নামে চলে, ওই রিকশাগুলোর জন্য টোকেন কিনতে হয় না। বিনা মূল্যে টোকেন দেওয়া হয়।

এর বাইরে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ১ হাজার ২০০ রিকশা এবং ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ১ হাজার ১০০ রিকশার জন্য টোকেন বিক্রি হয়। প্রতি টোকেনে এক হাজার টাকা হিসাবে প্রতি মাসে ২৩ লাখ টাকার টোকেন বিক্রি হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তুরাগের নতুনবাজার এলাকার এক রিকশামালিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ মাসের ৪ তারিখ ফারুক খানের কাছ থেকে রিকশার টোকেন কিনেছি। ২২টি রিকশায় ২২ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এটা রিকশামালিক ও চালকদের জন্য জুলুম।’ ওই রিকশামালিক জানান, টোকেন বিক্রির টাকার ভাগ স্থানীয় নেতা, থানা ও ট্রাফিক পুলিশের পকেটে যায়।

টোকেনগুলো লাগানো হয় রিকশার আসনের নিচে
টোকেনগুলো লাগানো হয় রিকশার আসনের নিচেছবি: প্রথম আলো
কাউন্সিলরপুত্র শফিকুলও পুলিশ সদস্যদের এই টাকার ভাগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা ওসি (তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা), ট্রাফিক পুলিশের যত লোক আছে, সবাই খায়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার নাবিদ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা এই টাকা নেন এমন কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, এলাকার বড় রাস্তায় অবৈধ এসব রিকশা এলে আটকে রাখা হয়।

সম্প্রতি তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে আসা মওদুত হাওলাদার বলেছেন, ‘টাকা লেনদেনের বিষয়টি আমার জানা নেই। এখানকার কাউকে সেভাবে এখনো চিনিও না। তাই এ বিষয়ে আপাতত আমার কোনো মন্তব্য নেই। তবে আপনারা যেহেতু তথ্য দিয়েছেন, আমরা তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখব এবং কারা কী করে তখন বলা যাবে।’ তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের মূল কাজ ট্রাফিক বিভাগের। তাদেরকে থানা পুলিশ মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করে এবং ওই অবৈধ রিকশা বন্ধ করার জন্য নির্দেশনাও রয়েছে।

প্রথম সপ্তাহেই রাস্তায় নেমে পরীক্ষা
প্রতি মাসের ৬ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে টাকা দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করতে হয়। নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে যাঁরা টোকেন কেনেন না, তাঁদের রিকশা আটকাতে রীতিমতো অভিযান চালান কথিত ওই সমিতির সদস্য ও তাঁদের কর্মীরা। টোকেন না কেনা চালক ও মালিকদের রিকশা কখনো আটক করে সমিতির কার্যালয়ে নেওয়া হয়, কখনো শুধু রিকশার গদি (চালক ও যাত্রীর বসার আসন) জব্দ করা হয়।

৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের নয়ানগর বাজার, ধরঙ্গারটেক, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর খালপাড় ও চেয়ারম্যানবাড়ি মোড় এলাকায় কথিত এই অভিযান চালানো হয়। সেখানে রিকশা আটকের কাজ করেন নাজমুলের কিশোর বাহিনী। স্থানীয়ভাবে তারা ‘সোহান গ্রুপ’ নামে পরিচিত। এই দলে ১২ জনের মতো কিশোর রয়েছে।

আর ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে সহযোগী লাইনম্যানদের নিয়ে অভিযান চালান ফারুক খান

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*