ওই তুই মাইয়া মানুষ, মাইয়া মানুষের মতো থাকবি, তুই কথা কবি ক্যান’

বাসভর্তি মানুষ। এর মধ্যেই মো. ফজলুল হক (৪৭) নামের লোকটি উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘ওই তুই মাইয়া মানুষ, মাইয়া মানুষের মতো থাকবি, তুই কথা কবি ক্যান।’ মেয়ে বলে কথা বলায় সমস্যা কোথায়, জানতে চাইলে আবার খেপে যান লোকটি। মা-বাবা তুলে গালি দিয়ে বাজে কথা বলেন। মা-বাবা ‘ব্যাটা’ (পুরুষ) মানুষের সঙ্গে কেমনে কথা বলতে হয়, তা কেন শেখাননি, সে প্রশ্নও করেন তিনি।

এ বিবরণ দিয়েছেন ঢাকায় চলন্ত বাসে এক যাত্রীর কাছে লাঞ্ছনা ও মারধরের শিকার হওয়া নারী উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা। গত শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে খিলক্ষেত থেকে নতুন বাজার যাওয়ার পথে আসমানী পরিবহনের একটি বাসে তাঁর সঙ্গে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল রোববার প্রথম আলো কার্যালয়ে এসে পুরো ঘটনা খুলে বলেন আবিদা। এ নির্যাতনের ন্যায্য বিচার চান তিনি।

 

ADVERTISEMENT
ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে আবিদা সুলতানা বলেন, মা-বাবা তুলে কেন গালি দিলেন এবং মেয়ে বলে কেন কথা বলতে পারবেন না, দাঁড়িয়ে তা বলতে গেলে প্রথমে তাঁকে দুটি থাপ্পড় দেন ফজলুল হক। এতে বাসের সিটে পড়ে যান আবিদা। নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ফজলুল হক হাতের মুঠোফোন দিয়ে তাঁর মাথা, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এলোপাতাড়ি মারতে থাকেন। আবিদার জামা ধরে টান দিয়ে কাছে টেনে নিয়েও মারতে উদ্যত হন তিনি।
এক প্রবীণ লোক বমি করায় তাঁকে বকাঝকা করছিলেন পাশের আসনে বসা ফজলুল হক। এর প্রতিবাদ করার জন্যই তিনি তাঁর (আবিদা) ওপর চড়াও হয়েছিলেন বলে জানান আবিদা সুলতানা। শুধু খারাপ কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ফজলুল হক, আবিদার গায়ে হাতও তোলেন তিনি।

ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে আবিদা বলেন, মা-বাবা তুলে কেন গালি দিলেন এবং মেয়ে বলে কেন কথা বলতে পারবেন না, দাঁড়িয়ে তা বলতে গেলে প্রথমে তাঁকে দুটি থাপ্পড় দেন ফজলুল হক। এতে বাসের সিটে পড়ে যান আবিদা। নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ফজলুল হক হাতের মুঠোফোন দিয়ে তাঁর মাথা, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এলোপাতাড়ি মারতে থাকেন। আবিদার জামা ধরে টান দিয়ে কাছে টেনে নিয়েও মারতে উদ্যত হন তিনি।

আবিদা সুলতানা বলেন, ‘দুই মিনিটের মধ্যে কী থেকে কী হলো, ঘটনার আকস্মিকতায় আমি ভীত-স্তব্ধ হয়ে যাই। আমি জরুরি সেবা নম্বরে (৯৯৯) কল দিয়ে ব্যস্ত পাই।’ রোববার সন্ধ্যায় প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে আবিদা যখন সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, সে সময় তাঁর বাবা আমিনুল ইসলাম ও মা ফৌজিয়া বেগম মেয়ের পাশে বসে ছিলেন।

মুঠোফোন দিয়ে আঘাত করায় আবিদার কপাল থেকে রক্ত বের হতে থাকে। চোখের নিচে কালচে দাগ হয়ে যায়। এ সময় বাসের একমাত্র পুরুষ যাত্রী এগিয়ে এসে ফজলুল হকের কাছে জানতে চান, তিনি একজন নারীর গায়ে হাত তুলছেন কেন? আবিদা সুলতানা বলেন, তখনো উত্তেজিত হয়ে থাকা ফজলুল হক তাঁকে মারতে উদ্যত হন। বলতে থাকেন, ‘মারসি তো কী হইসে, মলম-পট্টির টাকা দিয়া দিই।’ এই বলে মানিব্যাগ থেকে ৫০০ টাকা বের করে আবার আবিদাকে গালি দিয়ে বলেন, ‘৫০০ টাকায় চলব তোর?’
হামলার ন্যায্য বিচার চান আবিদা সুলতানা
হামলার ন্যায্য বিচার চান আবিদা সুলতানাছবি: তানভীর আহাম্মেদ
আবিদা জানান, ঘটনার দিন বাসে তাঁর পাশের আসনে বসেছিলেন এক বৃদ্ধ নারী, আর পেছনের সিটে ছিলেন ওই নারীর স্বামী। বয়স্ক লোকটি বমি করছিলেন। অসুস্থ ছিলেন। কুড়িল চৌরাস্তা থেকে মাঝবয়সী ফজলুল হক (মামলা করার পর আবিদা তাঁর নাম জানতে পেরেছেন) উঠে সেই অসুস্থ প্রবীণ ব্যক্তির পাশের সিটে বসেন। বমি করছেন বলে ওই বৃদ্ধাকে তিনি গালাগালি করতে থাকেন। বাস থেকে নেমে যেতে বলেন। তখন সামনের সিটে বসা আবিদা দাঁড়িয়ে ফজলুল হককে সিট পরিবর্তন করে আবিদার সিটে বসার অনুরোধ করেন। বাবার বয়সী একজন মানুষকে কেন গালি দিচ্ছেন, এ প্রশ্ন ফজলুল হককে করেছিলেন তিনি। এতেই আবিদার ওপর চড়াও হন ফজলুল হক।

মুঠোফোন দিয়ে আঘাত করায় আবিদার কপাল থেকে রক্ত বের হতে থাকে। চোখের নিচে কালচে দাগ হয়ে যায়। এ সময় বাসের একমাত্র পুরুষ যাত্রী এগিয়ে এসে ফজলুল হকের কাছে জানতে চান, তিনি একজন নারীর গায়ে হাত তুলছেন কেন? আবিদা সুলতানা জানান, তখনো উত্তেজিত হয়ে থাকা ফজলুল হক তাঁকে মারতে উদ্যত হন। বলতে থাকেন, ‘মারসি তো কী হইসে, মলম-পট্টির টাকা দিয়া দিই।’ এই বলে মানিব্যাগ থেকে ৫০০ টাকা বের করে আবার আবিদাকে গালি দিয়ে বলেন, ‘৫০০ টাকায় চলব তোর?’

আবিদা জানান, বাসটি ততক্ষণে নতুন বাজার স্টপেজের কাছাকাছি চলে এসেছে। তাঁর সেখানেই নামার কথা। সেখানে তাঁর এক বন্ধুর থাকার কথা ছিল। আবিদা তাঁর সেই বন্ধুকে ফোন করে বাসের নাম উল্লেখ করে শুধু বলেন, ‘একজন লোক মারতেছে, আমাকে বাঁচা।’ ওই বন্ধু নতুন বাজার পুলিশ বক্সের পুলিশকে ঘটনা জানিয়ে বাসটিকে থামাতে অনুরোধ করেন। বাসের চালক বাসের গতি কমালে আবিদার ওই বন্ধু এবং বাসের এক যাত্রী লোকটিকে বাস থেকে নামতে বাধ্য করেন। এরপর তাঁকে পুলিশ বক্সে নেওয়া হয়। সেখানে পুলিশের সামনেই উত্তেজিত হয়ে আবিদার সঙ্গে কথা বলতে থাকেন ফজলুল হক।

‘মামলার বাদীকে মারছে, তা সত্য। যে লোকটি মারছে, সে বেয়াদব। রূঢ় আচরণের জন্য আরেক ঘটনায় মার খেয়ে তার হাত ভেঙেছে, তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। আমরা বাসের নাম, নম্বর, চালক, সহকারী—সবাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। তদন্তে সবকিছু বের করতে কয়েক দিন সময় লাগবে।’
মো. সাইফুল ইসলাম, উপপরিদর্শক, ভাটারা থানা
আবিদা বলেন, ফজলুল হক তখন মুঠোফোনে কোনো এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে পুলিশ বক্সে ডেকে আনেন। তিনি বলার চেষ্টা করেন, সম্প্রতি কোনো এক ঝামেলায় মার খেয়ে ফজলুল হকের হাত ভেঙে গেছে। মানসিক সমস্যাও আছে তাঁর। পুলিশ বক্স থেকে আবিদা ও ফজলুল হককে ভাটারা থানায় পাঠানো হয়। তবে পুলিশ বক্সের দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা বাসের চালক, সহকারী বা কোনো যাত্রীর কাছ থেকে কোনো তথ্য সংগ্রহ করেননি বলে আবিদা ও এ ঘটনায় তাঁর করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

বাসের মধ্যে এই ব্যক্তিকে বকাঝকার প্রতিবাদ করায় আক্রান্ত হয়েছিলেন আবিদা সুলতানা
বাসের মধ্যে এই ব্যক্তিকে বকাঝকার প্রতিবাদ করায় আক্রান্ত হয়েছিলেন আবিদা সুলতানাছবি: সংগৃহীত
এ ঘটনায় আবিদা সুলতানা ভাটারা থানায় মামলা করেছেন। ১ অক্টোবর রাত একটায় করা ওই মামলায় আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩২৩,৩৫৪

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*