ধর্ম-উৎসব-মানবাধিকার

ধর্ম জনগোষ্ঠীর উপাদান। সুতরাং ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে জীবনের স্বাভাবিক অন্বেষাকে বিনষ্ট করা হয় এবং ধর্মের শাশ্বত শুভবোধকে খাটো করা হয়। ইসলামে আছে যে ‘লাকুম দীনকুম ওয়ালিয়াদিন’। অর্থাৎ আমার ধর্ম আমার, তোমার ধর্ম তোমার। কিন্তু ধর্মের প্রকৃত সত্য উপেক্ষা করে মানুষ যখন ধর্মান্ধ হয় তখনই সমূহ বিপদ ঘটে। নিজের ধর্মকে একতরফাভাবে বড় করে দেখতে গিয়ে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যের ওপর।

১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক হয়েছিল। নারী সংগঠন আন্দোলন করে এর প্রতিবাদ করে। তাদের স্লোগান ছিল- ‘যার ধর্ম তার কাছে, রাষ্ট্রের কী বলার আছে।’ অবশ্য নানা প্রতিবাদ সত্ত্বেও সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বাতিল হয়নি। একই সঙ্গে বলা যায়, শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম পালনও করতে পারছে না অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা। ধর্মীয় উৎসব এলেই তারা নানা ধরনের ভয় ও আতঙ্কে দিন কাটায়। তারা হামলার আশঙ্কা করে এবং হামলা যে হয় না- তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে এই আতঙ্ক হিন্দু সম্প্রদায়কে বেশি আতঙ্কিত করে। কারণ দুর্গাপূজার সময় প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা তাদের একটি নির্মম অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রের যে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুসারীদের জীবনে এ অভিজ্ঞতা বেশি হওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতা। তাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন জাতির সম্মিলিত প্রয়াস। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে একে মোকাবিলা করলে সমাজ পরিবর্তন স্থায়ী হয় না। তা আবার যে কোনো ধর্মান্ধ স্বার্থান্বেষী মহলের তাড়নায় মাথা তুলে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের এই ইতিহাস বিশ্নেষণ একটি নির্মম সত্য বলে প্রতীয়মান।
দুর্গাপূজার সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিমা বানানো প্রতিরোধ কিংবা প্রতিমা ভাঙার ঘটনা প্রমাণ করে- শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম পালনের পরিস্থিতি এ দেশে অনুপস্থিত, যতই তা সংবিধানে উল্লেখ থাকুক। ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় এ দেশে সম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে হিন্দু সম্প্রদায় ভয় ও আতঙ্ক থেকে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা বর্জন করেছিল। সে বছর ঘটপূজা করেছিল তারা। প্রতিমার সামনে মাটির ঘটের ওপর আমের পাতা, পুরো নারকেল, নতুন গামছা, ফুল, বেলপাতা ইত্যাদি রাখা হয়। পাঁচ ফোঁটা মেটেসিঁদুরের ওপর ধান-দূর্বা দিয়ে ঘট বসানো হয়। ঘটের সামনের অংশে চিত্রিত সিঁদুর থাকে। আমি মনে করি, এই ঘটপূজা শুধু ভয় বা আতঙ্ক থেকে নয়; প্রতিবাদের চিহ্নস্বরূপ। দেশের সব ধর্মের শান্তিকামী জনগণকে পূজা উৎসবের এই প্রতিবাদ মর্মাহত করেছিল।
আমি মনে করি, ‘সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ শব্দ দুটো এক অর্থে মানবিকতার লজ্জা ও গ্লানি। মানব সভ্যতার এমন কোনো শব্দের সৃষ্টি মানবিক বোধের ব্যর্থতার ফল। এই ব্যর্থতা বিভিন্ন সময়ে মানব সভ্যতার ধারাবাহিকতায় কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে। সময়ের সাদা হাত সে কলঙ্ককে মুছে ফেলতে পারে না।
যেখানে সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস, ঘৃণা এবং স্বার্থ সম্পর্কিত বিভেদের সৃষ্টি হয়, সেখানেই নষ্ট হয় সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এই সম্প্রীতি ভাঙা যেমন সহজ, রক্ষা করাও কঠিন। মানুষের ঘৃণ্য স্বার্থবুদ্ধি বিভিন্ন সংযোগে এমনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যে, মানুষের হাতে শুরু হয় মানুষের নিধন। এখানেই আমার আপত্তি। আমার অধিকার নিয়ে আমি বসবাস করব। কারও হাতে ক্রীড়নক হতে চাই না। সেটা ধর্মের নামে হোক বা অন্য কোনো অজুহাতে। তার পরও মানুষের বিকৃত উল্লাস কলঙ্কিত করেছে ইতিহাসের পৃষ্ঠা।
পঞ্চাশের দশকে আমার শৈশবে খুব কাছে দাঁড়িয়ে প্রতিমা বানানো দেখতাম। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ঢোলের শব্দ শুনলে একছুটে চলে যেতাম পূজামণ্ডপে। ঈদের দিনে কলাপাতায় মুড়ে সেমাই আর জরদা নিয়ে যেতাম বারুয়া মাঝির জন্য। তাকে দিয়ে যখন বলতাম, কাকু, তোমার জন্য, তখন দেখতাম তাঁর চোয়াল-ভাঙা চেহারার উজ্জ্বলতা। আর বাগদী মাসি পায়ে গোদ নিয়ে বসে থাকতেন আমাদের আশায়। আমরা ঈদের উৎসবে তাকে সেমাই-জরদা দিলে একগাল হেসে বলতেন, ‘এসেছিস তোরা? তোদের অপেক্ষায় বসে আছি।’
ফলো করুন-
ভিডিও দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন সমকাল ইউটিউব
এভাবে ঈদ-পূজা আমাদের জীবনে এসেছিল। আমরা তখন ধর্মীয় সংখ্যালঘু বুঝিনি। আমরা বুঝতাম মানুষের জন্য উৎসব; উৎসব শুধু ধর্মের জন্য নয়।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় আমরা দেখেছি উন্মত্ত হয়ে ওঠে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও ইত্যাদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চালায় তারা। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। সম্পদ নষ্ট করে। মন্দির ভাঙচুর করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অপরাধ করার জন্য যারা অভিযুক্ত হয়, তাদের তো দণ্ড পেতেই হবে- এটা কালের নিয়ম। এটা ইতিহাসের বিচার। কিন্তু যারা দণ্ডপ্রাপ্ত হয় তাদের অনুচর বাহিনী কত নির্মম হতে পারে- এ ঘটনা তার প্রমাণ। নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণে তারা বিবেকতাড়িত হয় না। ধর্মের শান্তির বাণী তাদের জীবন থেকে মুছে যায়। উন্মত্ততাকে তারা ধর্মের অংশ মনে করে। ন্যায়ের ভেদবুদ্ধির বাইরে চলে যায় তাদের মানবিক চেতনা। আবারও জড়ো হতে হয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে। মানুষের হাত মানুষের দিকে প্রসারিত হয়।
আমি আবারও বলি, সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমি জানি না। আমি এ ধরনের টানা বিভেদ রেখা মুছে দিয়ে ধর্মীয় দলাদলির ঊর্ধ্বে থাকতে চাই। সম্প্রদায়ের পরিচয়ের ভিত্তি কেন মানুষ হিসেবে হবে না? কেন ধর্ম কিংবা অন্য কোনো বিষয় মানুষের পরিচয় মুছে দিয়ে বড় হয়ে উঠবে? কেন স্বার্থসিদ্ধির দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এক দল তাড়া খেয়ে ছুটবে খানিক আশ্রয়ের জন্য? ভূপেন হাজারিকার একটি গানের লাইন এমন ‘সংখ্যালঘু কোনো সম্প্রদায়ের ভয়ার্ত মানুষের না ফোটা আর্তনাদ যখন গুমরে কাঁদে, আমি যেন তার নিরাপত্তা হই।’
এই গান শুনলে অদ্ভুত এক কালো পর্দা নেমে আসে মনের ওপর। ভয়ার্ত আর্তনাদ বুকের ভেতর গুমরে মরে। মানুষের চোখের জল স্তব্ধ করে দেয় সময়।
আমরা সব ধর্মের উৎসব নিজেদের উৎসব মনে করে ঐক্যের পতাকাতলে দাঁড়াতে চাই। আমরা যিশুখ্রিষ্টের বন্দনায় শরিক হতে চাই। আমরা গৌতম বুদ্ধের বন্দনায় শরিক হতে চাই। রাজনীতির কারণে মানুষকে আমরা সংখ্যালঘু বানাতে চাই না। রাজনীতির কারণে মানুষের নিধনযজ্ঞ আমরা দেখতে চাই না।

মানবিকতাই হোক আমাদের একমাত্র আশ্

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*